
রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্য করতে চায় তারা। রূপপুরের কিস্তির টাকা সোনালী ব্যাংকে আটকে আছে বছরের পর বছর, নিষেধাজ্ঞার প্যাঁচে আটকে গেছে হাজার কোটি টাকার লেনদেন। ইউয়ানে চেষ্টা হয়েছিল, হয়নি। এবার রুপিতে সুযোগ এসেছে সামনে। আর ঠিক এই জায়গায় এসে থমকে যাচ্ছে বিএনপি আর জামাত। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। কোনো অবস্থান নেই। যেন এটা তাদের দেশের বিষয়ই না।
অথচ এই দুই দলের মুখেই সবচেয়ে বেশি শোনা যায় জাতীয়তাবাদের বুলি। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, বিদেশি খবরদারি থেকে মুক্তি, এসব কথা মাইকে মাইকে বাজে তাদের সভায়। কিন্তু যেই মুহূর্তে সত্যিকারের একটা সুযোগ আসে দেশের অর্থনীতিকে একটামাত্র বিদেশি মুদ্রার জিম্মিদশা থেকে বের করার, তখনই তাদের গলা শুকিয়ে যায়। ডলারের বাইরে গিয়ে রুপিতে বাণিজ্য মানে ওয়াশিংটনের একটু হলেও অসন্তুষ্ট হওয়া। আর সেই অসন্তুষ্টির ভয়েই যেন সব জাতীয়তাবাদ ফুঁটুস করে চুপসে যায় বেলুনের মতো।
সোনালী ব্যাংকের ওই আটকে থাকা টাকাটা নিয়ে সরকার একটা প্রস্তাব দিয়েছিল, দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ করার। রাশিয়া রাজি হয়নি। এখন বিকল্প হিসেবে রুপির প্রস্তাব টেবিলে। এই সিদ্ধান্তটা নেওয়ার এখতিয়ার যাদের হাতে, সেই ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান শরিক বিএনপি আর সংসদে তাদের সঙ্গী জামাতে ইসলামী, দুই দলই যেন এই ইস্যুতে জিহ্বা কামড়ে বসে আছে। একবারও প্রকাশ্যে বলছে না, রুপিতে লেনদেন হোক নাকি না হোক। একবারও বলছে না, রূপপুরের আটকে থাকা টাকা নিয়ে তাদের পরিকল্পনা কী। এই নীরবতাটাই আসলে তাদের সত্যিকারের অবস্থান, শুধু সেটা তারা মুখ ফুটে বলছে না।
কেউ হয়তো বলবে, সতর্ক থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ, আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করে লাভ নেই, নিষেধাজ্ঞার আঁচ যেন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও না লাগে। এই যুক্তিটা একেবারে ফেলনা না, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঝুঁকি হিসেব করাটা স্বাভাবিক কূটনীতিরই অংশ। কিন্তু সতর্কতা আর নীরবতা এক জিনিস না। সতর্ক একটা সরকার অন্তত বলে, আমরা যাচাই করছি, শর্ত দেখছি, আলোচনা চলছে। আর নীরব একটা সরকার শুধু চুপ করে বসে থাকে, যতক্ষণ না প্রশ্নটা নিজে থেকেই হারিয়ে যায় মানুষের মন থেকে।
ভারত আর রাশিয়া কোনো আনুষ্ঠানিক মুদ্রা বিনিময় চুক্তি ছাড়াই রুপিতে বাণিজ্যের একটা অংশ চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে রুপিতে কিছু লেনদেন করছে ইতিমধ্যে। তাহলে রাশিয়ার সঙ্গে একই পথে হাঁটতে সমস্যা কোথায়, সেই ব্যাখ্যাটা অন্তত জাতির সামনে দেওয়া যেত। ঢাকায় রুশ ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাব, আলাদা পেমেন্ট অবকাঠামো, ব্যবসায় কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব, এতগুলো টেবিলে রাখা প্রস্তাবের একটার জবাবও এখনও স্পষ্ট করে দেয়নি সরকার।
আসল কথা হলো, বিদেশনীতিতে সাহস দেখানোর একটা সুযোগ এসেছিল, আর সেই সুযোগের সামনে দাঁড়িয়ে সরকার আর তার শরিকরা বেছে নিয়েছে নীরবতা। জাতীয়তাবাদের কথা বলে ভোট চাওয়া সহজ, কিন্তু আসল মুহূর্তে সেই জাতীয়তাবাদ প্রমাণ করার সময় এলে হাত গুটিয়ে বসে থাকাটাই যেন এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট আলাপ।